
মানবতাবিরোধী
অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছে ট্রাইব্যুনাল।
যে কোনোদিন এ মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে। গতকাল মাওলানা সাঈদীর পক্ষে
বিপক্ষে যুক্তিতর্ক শেষে চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন
সদস্যের প্রথম ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়।
এদিকে আদেশের আগ মুহূর্তে মাওলানা সাঈদী ট্রাইব্যুনালে তার বক্তব্যে বলেন,
মাননীয় আদালত, আজকের এই বিচার প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে দুটি পর্বে শেষ হবে।
একটি এই জাগতিক আদালতে আর অপরটি আখেরাতের আদালতে। আজ আমি এই আদালতের অসহায়
এক নির্দোষ আসামি আর আপনারা বিচারক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণে ক্ষমতার
জোরে আমার প্রতি যদি জুলুম করা হয়, তাহলে আজকের দুর্দান্ত প্রতাপশালী
ব্যক্তিবর্গ যারা একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে আদর্শিক কারণে প্রতিহিংসাপরায়ণ
হয়ে তার প্রতি জুলুমের প্রয়াস পাচ্ছেন, তারা দ্বিতীয় পর্বের বিচারের দিন,
কিয়ামতের দিন নিঃসন্দেহে আসামি হবেন। সেদিন আমি হব বাদী। আর সর্বশক্তিমান,
রাজাধিরাজ, সম্রাটের সম্রাট, আকাশ ও জমিনের সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিপতি,
সব বিচারের মহাবিচারপতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তিনিই হবেন সেদিনের
আমার দায়ের করা মামলার বিচার প্রক্রিয়ার বিচারক।
গতকাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের
ট্রাইব্যুনালে সকাল থেকেই আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম যুক্তি
উপস্থাপন শুরু করেন। বেলা পৌনে ৪টায় যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল
চেয়ারম্যান বলেন, আজ ৬ ডিসেম্বর। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর এই মামলায়
সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল। ঠিক এক বছরের মাথায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলো।
ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য ছাড়া আর কোনোদিকে তাকাবে না। সঠিক রায় দেয়ার চেষ্টা
করবে। ট্রাইব্যুনালের ওপর বিশ্বাস রাখবেন। নথিপত্রের বাইরে আর কিছু দেখা
হবে না। পরে ট্রাইব্যুনাল বিচারের রায় অপেক্ষমাণ রাখে। গতকাল আইনজীবী
মিজানুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরের জিয়ানগর
থানার ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা, মানিক পসারীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট,
মুক্তিযুদ্ধের পর আত্মগোপনে থাকা, দেলোয়ার শিকদার এবং মামলার আইও হেলাল
উদ্দিনের জবানবন্দি ও জেরার জবাবের বিষয়ে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেন।
তিনি এসব অভিযোগের বৈপরীত্ব তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালে।
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারী তার সাক্ষ্যে বলেছেন,
মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে পাকসেনা ও রাজাকাররা ১৯৭১ সালের ৮ মে তার বাড়িতে
হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, তার কাজের লোক ইব্রাহিম কুট্টি ও
তার ভাই মফিজ পসারীকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ইব্রাহিম কুট্টিকে পাড়েরহাট
বাজারের ব্রিজের কাছে সাঈদীর নির্দেশে পাকসেনারা গুলি করে হত্যা করে। মফিজ
পসারী পালিয়ে জীবন রক্ষা করে।
ট্রাইব্যুনালে মিজানুল ইসলাম বলেন, মানিক পসারী বাদী হয়ে পিরোজপুর আদালতে এ
বিষয়ে মাওলানা সাঈদীকে আসামি করে ২০১০ সালে একটি মামলা করেন। ওই মামলায়
মফিজ পসারী পিরোজপুর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছেন,
ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে যেতে তিনি দেখেননি। ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা
প্রসঙ্গে মিজানুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে বলেন, ইব্রাহিম কুট্টিকে নলবুনিয়া
গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর দানেশ মোল্লাসহ একদল রাজাকার
হত্যা করে। তার শ্যালক সাহেব আলী ওরফে সিরাজকে ধরে নিয়ে পিরোজপুরে
পাকসেনারা হত্যা করে। এ ঘটনায় ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম বাদী হয়ে
পাকিস্তান আর্মি ও দানেশ মোল্লাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই
পিরোজপুর থানায় একটি মামলা করেন। সে মামলায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।
মিজানুল ইসলাম বলেন, মামলার আইও হেলাল উদ্দিন মানিক পসারীর বাড়ির পুরো
আলামত ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছেন। অথচ মানিক পসারী টিভি সাক্ষাত্কারে
বলেছেন, বাড়ি পোড়ার কোনো আলামত তার কাছে নেই। আইনজীবী বলেন, তদন্ত
কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি ২০১০ সালের ১৮ আগস্ট পিরোজপুর সার্কিট হাউস থেকে
যান পিরোজপুর থানায়। সেখান থেকে যান পাড়েরহাট বাজারে। পাড়েরহাট থেকে বেলা
১২.৫৫ মিনিটে যান আবদুল আলিম বাবুলের বাড়িতে। এরপর যান চিতলিয়া গ্রামের
মানিক পসারীর বাড়িতে। আইনজীবী বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা মানিক পসারীর বাড়ির
আলামত জব্দ করার সময় দেখিয়েছেন ওইদিন বেলা ১১টায়। আইনজীবী বলেন, এ মামলার
আরেক বাদী এবং মানিক পসারীর বাড়ির আলামত জব্দের সাক্ষী মাহবুবুল আলম
হাওলাদার তার সাক্ষ্যে বলেছেন, মানিক পসারীর বাড়ি পোড়ানোর আলামত জব্দ করা
হয়েছে ৮ মে। আইনজীবী বলেন, ২০১০ সালের ২১ জুলাই বর্তমান মামলা দায়ের হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার কথামত ৮ মে যদি আলামত জব্দ করা হয়, তাহলে মামলা দায়েরের
আগে জব্দ হয় কীভাবে? বেলা সাড়ে ৩টায় আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী একটি ডকুমেন্ট ট্রাইব্যুনালে দাখিল
করে সংক্ষিপ্ত যুক্তি উপস্থাপন করেন।
উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে কাঠগড়ায় থাকা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন
সাঈদী ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। মাওলানা সাঈদীর
বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেয়।
ট্রাইব্যুনাল শেষে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘ
প্রায় এক বছর পর ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা নং ১ অর্থাত্ সাঈদীর মামলার
কার্যক্রম আজ শেষ হলো। তিনি বলেন, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে এ মামলার
সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। আজ সব কার্যক্রম শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি
অপেক্ষমাণ আদেশের দিন ধার্য করে।
সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, আসামির বিরুদ্ধে আনীত ২০টি অভিযোগের মধ্যে ১৯টি
প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের দাখিল করা দালিলিক প্রমাণ এবং সাক্ষীদের
জবানবন্দির মাধ্যমে আশা করছি তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।
অন্যদিকে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে
অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। প্রসিকিউশনের আনীত অভিযোগ
সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এ অভিযোগে তার একদিনের জন্যও শাস্তি হতে পারে
না। তিনি বলেন, দেলোয়ার হোসেন শিকদার নামের এক রাজাকারের অভিযোগ সাঈদীর ওপর
চাপানোর চেষ্টা করেছে প্রসিকিউশন। তিনি বলেন, শিকদার এবং সাঈদী এক নয়।
শিকদার ভিন্ন ব্যক্তি। প্রসিকিউশন তার অভিযোগ সাঈদীর নামে চালিয়ে দিচ্ছে।
গত ৫ নভেম্বর থেকে সাঈদীর মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে প্রসিকিউশন তাদের
যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে ১৫ নভেম্বর সম্পন্ন করেছে। পরে আসামিপক্ষ মোট ১৩
দিনে ২১ সেশনে তাদের যুক্তি উপস্থাপন করে।
প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটকদের মধ্যে একমাত্র দেলাওয়ার
হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন, আসামিপক্ষের সাক্ষী ও তদন্ত
কর্মকর্তাসহ সবার জবানবন্দি গ্রহণ এবং জেরা শেষ হয়েছে। মামলাটির চূড়ান্ত
নিষ্পত্তির জন্য প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলো।
এখন শুধু মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় থাকল।
মাওলানা সাঈদীকে একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১০ সালের ২ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার দেখানো
হয়। গত বছরের ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়
ট্রাইব্যুনাল। ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলায়
বিচার শুরু হয়।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে পিরোজপুর জেলায় হত্যা, গণহত্যা,
ধর্ষণ এবং এ ধরনের অপরাধে সাহায্য করা ও জড়িত থাকার ঘটনায় ২০টি অভিযোগ আনা
হয়। এ মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় গত বছরের ৭
ডিসেম্বর। এরপর ২ সেপ্টেম্বর থেকে আসামিপক্ষের সাক্ষীদের সাফাই
সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। আসামিপক্ষের ১৭ জনের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ ২৩ আক্টোবর
শেষ হয়। সেদিনই এ মামলায় উভয়পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত করে যুক্তিতর্ক
পেশের দিন ধার্য করা হয়।
প্রসিকিউশনের মূল সাক্ষী ১৮জন, সিজারলিস্টের ৯ জন ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা
(আইও) হেলাল উদ্দিনসহ মোট ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০
জন ঘটনার এবং ৭ জন জব্দ তালিকার সাক্ষী। এছাড়া প্রসিকিউশনের আবেদনের
পরিপ্রেক্ষিতে আইও’র কাছে দেয়া ১৬ সাক্ষীর জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালের আদেশে
সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার
বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের বাকি একজনের সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী রোববার দিন
নির্দিষ্ট করে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে আগামী সোমবার থেকেই এ
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আরগুমেন্ট (যুক্তিতর্ক) শুরু হবে। গতকাল আন্তর্জাতিক
অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দিয়েছেন।
এর আগে গতকাল ট্রাইব্যুনালে কাদের মোল্লার পক্ষের পঞ্চম সাক্ষী
মুক্তিযুদ্ধকালে মিরপুরের অন্যতম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নবীউল্লাহ মোল্লার আপন
ভাতিজাকে জেরা করেছে প্রসিকিউটর মো. আলী। এ মামলায় আসামিপক্ষের আরেকজন
সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়া বাকি আছে। তাকে আগামী রোববার সাক্ষ্য দিতে হবে।
অন্যথায় আসামিপক্ষকে আর কোনো সুযোগ দেয়া হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে
ট্রাইব্যুনাল-২।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের
বিরুদ্ধে গতকাল ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী
ফরিদপুরের নারায়ণ চন্দ্র সরকার। ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে তিনি
বলেছেন, ১৯৭১ সালে আমি খুবই ছোট ছিলাম। তখনকার সবকিছু আমার ঠিকভাবে মনেও
নেই। তবে ওই সময় একদিন আমি ভোরে সিদ্ধিশ্বর নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পাশের
জঙ্গলে পালিয়ে ছিলাম। সিদ্ধিশ্বর আমাকে বলেছিল, ওই দেখ, আর্মিদের সঙ্গে
গফুর রাজাকার ও মুজাহিদ আসছে। আমি তখন মুজাহিদ সাহেবকে চিনতামও না।
চেয়ারম্যান এ টি এম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য ওবায়দুল হাসান ও
শাহিনুর ইসলাম সাক্ষীর দেয়া জবানবন্দি ও জেরা রেকর্ড করেন। ট্রাইব্যুনালে
ডিফেন্সপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান সাক্ষীকে জেরা শুরু
করেন। আগামী ১২ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে
একই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অষ্টম সাক্ষীকেও জেরা করেন ডিফেন্স আইনজীবী।
ট্রাইব্যুনালে দেয়া মাওলানা সাঈদীর বক্তব্য : গতকাল ট্রাইব্যুনালে দেয়া
মাওলানা সাঈদীর বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো। মাননীয় আদালত, আমি দেলাওয়ার
হোসাইন সাঈদী। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলার
আপামর জনগণের অতিপরিচিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। আল্লাহ সাক্ষী, তদন্ত
কর্মকর্তা হেলাল উদ্দীনের রচিত দেলোয়ার শিকদার বর্তমান সাঈদী বা দেলোয়ার
শিকদার ওরফে দেলু ওরফে দেইল্যা রাজাকার আমি নই।
গণতন্ত্রের লেবাসধারী বর্তমান আওয়ামী সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত
যুদ্ধাপরাধের দায় চাপানোর মিশন নিয়ে হেলাল উদ্দিনকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে
দিয়েছে। মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠায় স্বনামখ্যাত হেলাল উদ্দীন আমার বিরুদ্ধে ২০টি
জঘন্য মিথ্যা অভিযোগ এনে সরকারি ও দলীয় আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে গিয়ে
আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য আমার নাম বিকৃত করেছে। আমার পারিবারিক
পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে লুটেরা, খুনি, ধর্ষক,
নারী সরবরাহকারী, অগ্নিসংযোগকারী পাকবাহিনীর দোসর, দুর্ধর্ষ রাজাকার—এককথায়
এ তদন্ত কর্মকর্তা মনের মাধুরী মিশিয়ে চার হাজার পৃষ্ঠার নাটক রচনা করেছেন
আমার বিরুদ্ধে।
কোনো মুসলমানের কলিজায় সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস
থাকলে মৃত্যুর ভয় থাকলে, পরকালে আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয় থাকলে,
জাহান্নামের কঠিন শাস্তির ভয় থাকলে অন্য কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে শুধু
আদর্শিক ও রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে এত জঘন্য মিথ্যাচার করা আদৌ সম্ভব হতো
না।
মাননীয় আদালত, আজকের এই বিচার প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে দুটি পর্বে শেষ হবে।
একটি এই জাগতিক আদালতে আর অপরটি আখেরাতের আদালতে। আজ আমি এই আদালতের অসহায়
এক নির্দোষ আসামি আর আপনারা বিচারক।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণে ক্ষমতার জোরে আমার প্রতি যদি জুলুম করা হয়,
তাহলে আজকের দুর্দান্ত প্রতাপশালী ব্যক্তিবর্গ, যারা একজন নির্দোষ
ব্যক্তিকে আদর্শিক কারণে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আমার প্রতি জুলুমের প্রয়াস
পাচ্ছেন, তারা দ্বিতীয় পর্বের বিচারের দিন, কিয়ামতের দিন তারা নিঃসন্দেহে
আসামি হবে। সেদিন আমি হব বাদী আর সর্বশক্তিমান, রাজাধিরাজ, সম্রাটের
সম্রাট, আকাশ ও জমিনের সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিপতি, সকল বিচারের
মহাবিচারপতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তিনিই হবেন সেদিনের আমার দায়ের করা
মামলার বিচার প্রক্রিয়ার বিচারক। সুরা আত ত্বীনের ৮ নং আয়াত আল্লাহ তায়াল
বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কি সকল বিচারকের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বিচারক নন?’ সুরা
দোখানের ১৬নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘একদিন আমি এদেরকে অবশ্যই কঠোরভাবে
পাকড়াও করব এবং নিশ্চয় প্রতিশোধ নেবই।’
মাননীয় আদালত, আপনাদের এই আদালতে বসে যার হাতের মুঠোয় আমাদের সকলের জীবন,
সেই মহাশক্তিধর আল্লাহ তায়ালার নামে শপথ করছি। তাঁর পবিত্র কোরআন স্পর্শ
করে কসম করে বলছি, আমার নামে আপনাদের এ আদালতে যতগুলো অভিযোগ আনা হয়েছে,
তার হাজার কোটি মাইলের মধ্যে আমার অবস্থান ছিল না। উত্থাপিত অভিযোগের একটি
বর্ণনাও সত্য নয়। আল্লাহর কসম! সব ঘটনা বা দুর্ঘটনার সঙ্গে
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার নাম যোগ করা হয়েছে। এ সকল অভিযোগের সঙ্গে আমার
দূরতম সম্পর্ক নেই।
মাননীয় আদালত, আমি আশা করি, সকল প্রকার রাগ-অনুরাগ ও সকল প্রকারের চাপ ও
আদেশ নির্দেশের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও মিথ্যা সার্বিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে সকল
প্রকার প্রভাবমুক্ত হয়ে শুধু মহান আল্লাহকে ভয় করে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি
থেকে বাঁচার লক্ষ্যে আমার প্রতি জুলুম না করে ন্যায়বিচার করবেন। মহান
আল্লাহ আপনাদের সে তওফিক দান করুন।
সুতরাং আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণে যিনি যতটা ষড়যন্ত্র করে,
জঘন্য থেকে জঘন্যতর মিথ্যা মামলা দিয়ে, মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে, মিথ্যা সাক্ষীর
প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাকে মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছেন, দেশ-বিদেশে অসংখ্য-অগণিত
মানুষের কাছে কোরআনের বাণী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমাকে বঞ্চিত করেছেন, আমার
প্রিয়জনদের কাঁদাচ্ছেন, কলঙ্কের তিলক পরিয়ে আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন
করেছেন, আমি দোয়া করি আল্লাহ তাদের হেদায়েত করুন। আর হেদায়েত যদি তাদের
নসিবে না থাকে, তাহলে আমার এবং আমার প্রিয়জন, আমার কলিজার টুকরা সন্তান,
বিশ্বব্যাপী আমার ভক্ত-অনুরক্তদের যত চোখের পানি ফেলানো হয়েছে, তাদের সকলের
প্রতি ফোঁটা চোখের পানি অভিশাপের বহ্নিশিখা হয়ে আমার থেকে শত গুণ যন্ত্রণা
ভোগের আগে, কষ্ট ভোগের আগে আল্লাহ তায়ালা যেন তাদের মৃত্যু না দেন।
মিথ্যাবাদী ও জালিমদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ অযুত ধারায় বর্ষিত হোক। আর
জাহান্নাম যেন হয় এদের চিরস্থায়ী ঠিকানা।